4:02 am, Saturday, 18 July 2026

লবণাক্ততার আগ্রাসনে অস্তিত্ব সংকটে রাজাপুর: হারিয়ে যাচ্ছে কৃষি, বাড়ছে জনদুর্ভোগ।

  • Reporter Name
  • Update Time : 03:07:48 am, Thursday, 16 July 2026
  • 36 Time View

নিজস্ব প্রতিবেদন

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার নুরনগর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রাম আজ লবণাক্ততার নির্মম বাস্তবতায় জর্জরিত। একসময় যে গ্রামে বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল উৎপাদিত হতো, আজ সেই বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পরিণত হয়েছে লবণাক্ত পানির মাছের ঘেরে। নিরাপদ সুপেয় পানির তীব্র সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে রাজাপুরের মানুষের জীবন আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, একসময় রাজাপুরে ইরি ধান, আমন ধান, পাট, রসুন, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষ হতো। কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত ফসলের ওপর নির্ভর করে স্বচ্ছল জীবনযাপন করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে লবণাক্ত পানির বিস্তার এবং চিংড়ির ঘের সম্প্রসারণের ফলে সেই কৃষিভিত্তিক জনপদ আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।

রাজাপুর গ্রামে বর্তমানে প্রায় ৫৭টি পরিবারের বসবাস। আনুমানিক ১,০০০ থেকে ১,২০০ বিঘা এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই গ্রামে এখন কৃষি উপযোগী জমি বলতে প্রায় কিছুই নেই। একসময় যে জমিতে সোনালি ধান দুলত, সেখানে আজ সারা বছর লবণাক্ত পানির ঘের।

স্থানীয়রা জানান, রাজাপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত কালিন্দী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত মেছোখালি খাল এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত চেয়ারম্যানের খাল দিয়ে বছরের প্রায় বারো মাসই লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে। যে খালগুলো একসময় পানি নিষ্কাশনের কাজে ব্যবহৃত হতো, বর্তমানে সেগুলোর মাধ্যমে লবণাক্ত পানি এনে মাছ চাষ করা হচ্ছে। এর ফলে আশপাশের কৃষিজমিতেও ধীরে ধীরে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে।

গ্রামবাসীর অভিযোগ, পাশের জমিতে লবণাক্ত পানির ঘের করা হলে আশপাশের কৃষিজমিও নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষকরা ইচ্ছা না থাকলেও বাধ্য হয়ে নিজের জমিকেও ঘেরে রূপান্তর করেন। এভাবে কৃষির বিকল্প পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ মাছের ঘের করেও সবাই লাভবান হন না। বিভিন্ন সময়ে বাগদা ও গলদা চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ায় বহু খামারি ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

রাজাপুরের সবচেয়ে বড় সংকট নিরাপদ সুপেয় পানি। পুরো গ্রামে পানযোগ্য পানির কোনো স্থায়ী সরকারি ব্যবস্থা নেই। ফলে অধিকাংশ পরিবারকে প্রতিদিন টাকা দিয়ে পানি কিনে পান করতে হয়। প্রতি লিটার পানির জন্য ১ থেকে ১.৫ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অতিরিক্ত বোঝা।

এ গ্রামে নেই কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা কিংবা শিশুদের জন্য কোনো গণশিক্ষা কেন্দ্র। নেই কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক বা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। সামান্য চিকিৎসার জন্যও কয়েক কিলোমিটার দূরের এলাকায় যেতে হয়। এতে অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

যোগাযোগ ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। গ্রামের একমাত্র সড়কটি বর্ষা মৌসুমে কাদা ও জলাবদ্ধতায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। রাস্তার দুই পাশে কাদা জমে থাকায় মোটরসাইকেল, সাইকেল এমনকি পথচারীরাও প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেন।

শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য কোনো সরকারি খেলার মাঠ নেই। ফলে তারা সুস্থ বিনোদন ও শারীরিক বিকাশের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে লবণাক্ততার কারণে গ্রামে বড় গাছপালা জন্মায় না, গৃহপালিত পশু পালনও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপদাহে বৃক্ষহীন রাজাপুর যেন মরুভূমির রূপ ধারণ করে।

গ্রামবাসীর দাবি, রাজাপুরকে বাঁচাতে অবিলম্বে নিরাপদ সুপেয় পানির স্থায়ী সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, লবণাক্ত পানির অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ রোধে কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষিজমি সংরক্ষণ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বা গণশিক্ষা কেন্দ্র, একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি সরকারি খেলার মাঠ এবং টেকসই পাকা সড়ক নির্মাণ করা হোক।

স্থানীয়দের বিশ্বাস, সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ, পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে একসময়ের সবুজ-শ্যামল রাজাপুর আবারও প্রাণ ফিরে পাবে। অন্যথায় লবণাক্ততার আগ্রাসনে গ্রামটি ভবিষ্যতে আরও গভীর সংকটের মুখে পড়বে।

প্রতিবেদক:

আব্দুল্লাহ আল মনির

দৈনিক আমার স্বাধীনতা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

লবণাক্ততার আগ্রাসনে অস্তিত্ব সংকটে রাজাপুর: হারিয়ে যাচ্ছে কৃষি, বাড়ছে জনদুর্ভোগ।

Update Time : 03:07:48 am, Thursday, 16 July 2026

নিজস্ব প্রতিবেদন

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার নুরনগর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রাম আজ লবণাক্ততার নির্মম বাস্তবতায় জর্জরিত। একসময় যে গ্রামে বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল উৎপাদিত হতো, আজ সেই বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পরিণত হয়েছে লবণাক্ত পানির মাছের ঘেরে। নিরাপদ সুপেয় পানির তীব্র সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে রাজাপুরের মানুষের জীবন আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, একসময় রাজাপুরে ইরি ধান, আমন ধান, পাট, রসুন, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষ হতো। কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত ফসলের ওপর নির্ভর করে স্বচ্ছল জীবনযাপন করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে লবণাক্ত পানির বিস্তার এবং চিংড়ির ঘের সম্প্রসারণের ফলে সেই কৃষিভিত্তিক জনপদ আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।

রাজাপুর গ্রামে বর্তমানে প্রায় ৫৭টি পরিবারের বসবাস। আনুমানিক ১,০০০ থেকে ১,২০০ বিঘা এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই গ্রামে এখন কৃষি উপযোগী জমি বলতে প্রায় কিছুই নেই। একসময় যে জমিতে সোনালি ধান দুলত, সেখানে আজ সারা বছর লবণাক্ত পানির ঘের।

স্থানীয়রা জানান, রাজাপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত কালিন্দী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত মেছোখালি খাল এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত চেয়ারম্যানের খাল দিয়ে বছরের প্রায় বারো মাসই লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে। যে খালগুলো একসময় পানি নিষ্কাশনের কাজে ব্যবহৃত হতো, বর্তমানে সেগুলোর মাধ্যমে লবণাক্ত পানি এনে মাছ চাষ করা হচ্ছে। এর ফলে আশপাশের কৃষিজমিতেও ধীরে ধীরে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে।

গ্রামবাসীর অভিযোগ, পাশের জমিতে লবণাক্ত পানির ঘের করা হলে আশপাশের কৃষিজমিও নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষকরা ইচ্ছা না থাকলেও বাধ্য হয়ে নিজের জমিকেও ঘেরে রূপান্তর করেন। এভাবে কৃষির বিকল্প পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ মাছের ঘের করেও সবাই লাভবান হন না। বিভিন্ন সময়ে বাগদা ও গলদা চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ায় বহু খামারি ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

রাজাপুরের সবচেয়ে বড় সংকট নিরাপদ সুপেয় পানি। পুরো গ্রামে পানযোগ্য পানির কোনো স্থায়ী সরকারি ব্যবস্থা নেই। ফলে অধিকাংশ পরিবারকে প্রতিদিন টাকা দিয়ে পানি কিনে পান করতে হয়। প্রতি লিটার পানির জন্য ১ থেকে ১.৫ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অতিরিক্ত বোঝা।

এ গ্রামে নেই কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা কিংবা শিশুদের জন্য কোনো গণশিক্ষা কেন্দ্র। নেই কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক বা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। সামান্য চিকিৎসার জন্যও কয়েক কিলোমিটার দূরের এলাকায় যেতে হয়। এতে অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

যোগাযোগ ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। গ্রামের একমাত্র সড়কটি বর্ষা মৌসুমে কাদা ও জলাবদ্ধতায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। রাস্তার দুই পাশে কাদা জমে থাকায় মোটরসাইকেল, সাইকেল এমনকি পথচারীরাও প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেন।

শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য কোনো সরকারি খেলার মাঠ নেই। ফলে তারা সুস্থ বিনোদন ও শারীরিক বিকাশের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে লবণাক্ততার কারণে গ্রামে বড় গাছপালা জন্মায় না, গৃহপালিত পশু পালনও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপদাহে বৃক্ষহীন রাজাপুর যেন মরুভূমির রূপ ধারণ করে।

গ্রামবাসীর দাবি, রাজাপুরকে বাঁচাতে অবিলম্বে নিরাপদ সুপেয় পানির স্থায়ী সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, লবণাক্ত পানির অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ রোধে কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষিজমি সংরক্ষণ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বা গণশিক্ষা কেন্দ্র, একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি সরকারি খেলার মাঠ এবং টেকসই পাকা সড়ক নির্মাণ করা হোক।

স্থানীয়দের বিশ্বাস, সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ, পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে একসময়ের সবুজ-শ্যামল রাজাপুর আবারও প্রাণ ফিরে পাবে। অন্যথায় লবণাক্ততার আগ্রাসনে গ্রামটি ভবিষ্যতে আরও গভীর সংকটের মুখে পড়বে।

প্রতিবেদক:

আব্দুল্লাহ আল মনির

দৈনিক আমার স্বাধীনতা