নিজস্ব প্রতিবেদক:
মোঃ সেলিম মিয়া
বিশেষ প্রতিনিধি
রাজধানী ঢাকার পাশ দিয়ে বয়ে চলা তুরাগ নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি এই অঞ্চলের মানুষের জীবন, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনোদন ও প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের এক নিবিড় সম্পর্কের অংশ। বর্ষা ও অনুকূল মৌসুমে নদীর পানিতে নৌকা চলাচল এবং বিভিন্ন দলকে পিকনিকের উদ্দেশ্যে নৌভ্রমণে যেতে দেখা যায়। নদীর বুকে নৌকার ঢেউ, দুই তীরের সবুজ গাছপালা ও শহুরে জনবসতির দৃশ্য মিলিয়ে তৈরি হয় এক ভিন্ন আবহ।
সম্প্রতি তুরাগ নদীতে দেখা গেছে এমনই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। একটি সুসজ্জিত নৌকায় দলবেঁধে মানুষ পিকনিকের উদ্দেশ্যে নদীতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। নৌকার ছাউনির নিচে যাত্রীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস এবং নদীর পানিতে নৌকার চলার দৃশ্য যেন ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝে কিছুটা প্রশান্তির বার্তা দিচ্ছে।
দুই পাড়ে দুই জেলার জনজীবন
তুরাগের একদিকে ঢাকার জনবসতি, অন্যদিকে গাজীপুরের বিস্তৃত এলাকা—নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে ঘনবসতি, দোকানপাট, ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা। কোথাও নদীর পাড়ে সিঁড়ি দিয়ে মানুষ নৌকায় ওঠানামা করছেন, কোথাও দেখা যাচ্ছে স্থানীয় দোকান ও মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড।
নদীর তীর ঘেঁষে বসবাসকারী অনেক মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও তুরাগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। নৌযান চলাচল, নদীকেন্দ্রিক ছোটখাটো ব্যবসা এবং বিনোদন—সব মিলিয়ে তুরাগ এখনো স্থানীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পিকনিকের নৌকায় আনন্দ
ছবিতে দেখা যায়, রঙিন সাজসজ্জায় সজ্জিত একটি নৌকা নদীর বুকে যাত্রী নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। নৌকাটিতে থাকা মানুষজন দলবদ্ধভাবে সময় কাটাচ্ছেন। শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে নদীর বুকে নৌবিহার ও পিকনিকের আনন্দ উপভোগ করছেন তারা।
বিশেষ করে ছুটির দিন বা অবসর সময়ে এ ধরনের নৌভ্রমণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। পরিবার, বন্ধু কিংবা বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা দলবদ্ধ হয়ে নৌকায় ঘুরতে বের হন। তুরাগের পানিতে নৌকার চলাচল এবং দুই পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য তাদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সৌন্দর্যের পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে
তবে তুরাগ নদীর সৌন্দর্যের পাশাপাশি নদীর দুই পাড়ের কিছু দৃশ্য উদ্বেগও তৈরি করে। ছবিতে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে থাকা আবর্জনা, অপরিচ্ছন্ন পাড় এবং অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনার চিত্র দেখা যায়। এসব কারণে নদীর পরিবেশ ও নান্দনিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
একদিকে মানুষ নদীর বুকে পিকনিক ও নৌভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করছেন, অন্যদিকে নদীর তীরে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় বৈপরীত্য। নদীকে ভালো রাখতে হলে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, নৌযাত্রী ও সাধারণ নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
তুরাগ রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
তুরাগ নদীকে দূষণমুক্ত ও সুন্দর রাখতে নদীর তীর নিয়মিত পরিষ্কার করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা, অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ এবং নদীতে ময়লা ফেলা বন্ধে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে নৌযান চলাচল ও পর্যটনধর্মী নৌবিহারকে আরও নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করা প্রয়োজন। পিকনিকের নৌযানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, লাইফ জ্যাকেট এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তুরাগ নদীকে ঘিরে পরিকল্পিত নৌবিহার ও বিনোদনকেন্দ্রিক কার্যক্রম গড়ে তোলা গেলে এটি মানুষের বিনোদনের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
নদী বাঁচলে বাঁচবে ভবিষ্যৎ
তুরাগের বুকের এই নৌকা, দুই তীরের মানুষ, সবুজ গাছপালা এবং শহুরে জীবন—সবকিছু মিলিয়ে নদীটি আমাদের নগরজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শুধু পিকনিক বা নৌবিহারের সময় নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করলেই হবে না; নদীর অস্তিত্ব ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বও নিতে হবে।
তুরাগ নদীকে দূষণমুক্ত, দখলমুক্ত ও নান্দনিক রাখতে এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। নদী বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, আর প্রকৃতি বাঁচলে নিরাপদ থাকবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
ছবি ও প্রতিবেদন:
মোঃ সেলিম মিয়া
বিশেষ প্রতিনিধি
















