Tue. Jul 21st, 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক আমার স্বাধীনতা

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার নূরনগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের রাজাপুর মৌজার অন্তর্গত ছোট রাজাপুর গ্রাম আজ লবণাক্ততা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, শিক্ষাব্যবস্থার অনুপস্থিতি, ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে চরম সংকটের মুখোমুখি। একসময়ের কৃষিনির্ভর এই জনপদে এখন কৃষিজমি প্রায় বিলুপ্ত। বিস্তীর্ণ এলাকা লবণাক্ত পানির চিংড়ি ঘেরে রূপ নেওয়ায় কৃষকেরা হারিয়েছেন তাদের জীবিকা, আর গ্রাম হারিয়েছে তার সবুজ ঐতিহ্য।

নূরনগর বাজার থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত রাজাপুর গ্রামের পশ্চিমে কাটাখালী, উত্তরে রামচন্দ্রপুর, দক্ষিণে দুরমুজখালী এবং পূর্বে ছোট শ্যামনগর গ্রাম। গ্রামের দক্ষিণে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে কালিন্দী নদী প্রবাহিত হয়েছে, যার পানি লবণাক্ত।

গ্রামের পশ্চিমে ঘোড়াখালী খাল (স্থানীয়ভাবে চেয়ারম্যানের খাল), দক্ষিণে মেসোখালী খাল, উত্তরে রাজাপুর-রামচন্দ্রপুর সীমান্তবর্তী খাল এবং পূর্বে একটি সরকারি খাল রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অতীতে এসব খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে মিঠা পানির সুবিধা সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমানে খালের মাধ্যমে লবণাক্ত পানি প্রবেশের ফলে কৃষিজমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এবং ধানসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

রাজাপুর মৌজায় আনুমানিক ১,০০০ থেকে ১,২০০ বিঘা জমি রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বর্তমানে অধিকাংশ জমিই লবণাক্ত পানির ঘের হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে কৃষি কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কৃষিজমি না থাকায় গবাদিপশু পালনও সীমিত। অধিকাংশ পরিবার সামান্য কয়েকটি গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস ও মুরগি পালন করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছে।

গ্রামে মোট পরিবার ৭২টি এবং জনসংখ্যা প্রায় ৩১৫ জন। তরফদার, কারিগর, সরদার, গাজী, গাইন ও মল্লিকসহ বিভিন্ন বংশের মানুষের বসবাস এখানে। শিক্ষার হার আনুমানিক ৪০ শতাংশ হলেও গ্রামে কোনো সরকারি বা বেসরকারি বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মক্তব কিংবা গণশিক্ষা কেন্দ্র নেই। একটি মাত্র পাঞ্জেগানা মসজিদ রয়েছে। শিশু-কিশোরদের পড়াশোনার জন্য অন্য গ্রামে যেতে হয়।

বিশুদ্ধ পানির সংকট রাজাপুরের অন্যতম প্রধান সমস্যা। গ্রামে কোনো গভীর নলকূপ, পানি পরিশোধন কেন্দ্র বা সরকারি নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নেই। সব পুকুরের পানিই লবণাক্ত। ফলে অধিকাংশ পরিবারকে নূরনগর বাজার থেকে প্রতি লিটার প্রায় ১ থেকে ১.৫০ টাকা ব্যয়ে বিশুদ্ধ পানি কিনে আনতে হয়। গোসলের জন্যও অনেক ক্ষেত্রে লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভর করতে হয়।

পরিবেশগত অবস্থাও অত্যন্ত প্রতিকূল। বৈশাখসহ গ্রীষ্ম মৌসুমে তীব্র তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। গ্রামে কেবল অল্প কিছু সিরিশ, খেজুর, বেল, তেঁতুল ও কলাগাছ রয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে লবণাক্ত ঘের থাকায় সবুজের পরিমাণ খুবই কম। শিশুদের খেলাধুলার জন্য কোনো মাঠ বা উন্মুক্ত স্থান নেই।

যোগাযোগ ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। গ্রামে মাত্র প্রায় ৫০০ মিটার ইটের রাস্তা রয়েছে, বাকি সব রাস্তা কাঁচা। বর্ষাকালে কাদায় এসব রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষা, চিকিৎসা ও জরুরি সেবাসহ দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়।

বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবী ৫ জন, ব্যাংকার ১ জন, বেসরকারি চাকরিজীবী ৫ জন, সেনাবাহিনীর সদস্য ২ জন, গার্মেন্টস কর্মী ১২ জন, সাংবাদিক ২ জন এবং প্রবাসী ১৪ জন রয়েছেন। এছাড়া অনেকেই দিনমজুরি, শ্রমিকের কাজ, ভ্যান চালানো, হকারি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সীমিত পরিসরে চিংড়ি ঘেরের সঙ্গে যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, লবণাক্ততা, নিরাপদ পানির অভাব, কৃষির বিলুপ্তি এবং কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে অনেক পরিবার রাজাপুর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, রাজাপুরের খালগুলো পুনরুদ্ধার, লবণাক্ত পানির অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, গ্রামীণ সড়কের উন্নয়ন এবং কৃষি পুনরুজ্জীবনে দ্রুত কার্যকর সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

রাজাপুরের মানুষের প্রশ্ন একটাই—স্বাধীনতার এত বছর পরও মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আর কতদিন বেঁচে থাকতে হবে?

By Admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *