বিশেষ প্রতিবেদন
একজন প্রবাসীর হাসিমাখা ছবির পেছনে কতটা কষ্ট, কতটা ত্যাগ আর কতটা নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে থাকে, তা খুব কম মানুষই জানেন। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এবং সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে লাখো বাংলাদেশি আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কঠোর পরিশ্রম করছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। অথচ এই মানুষগুলোর জীবনের বাস্তবতা অনেকটাই অজানা।
প্রবাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অধিকাংশ মানুষের জন্য জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তগুলোর একটি। অনেকেই বিদেশে যাওয়ার জন্য বসতভিটা বন্ধক রাখেন, কৃষিজমি বিক্রি করেন, গরু-ছাগল বিক্রি করেন কিংবা এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেন। পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আশায় তাঁরা অচেনা এক দেশে পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানে পৌঁছে অনেকেই জানতে পারেন, যে কাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার সঙ্গে কোনো মিল নেই। অনেকের বেতন কমিয়ে দেওয়া হয়, আবার কেউ কেউ মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটান।
মধ্যপ্রাচ্যের ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় নির্মাণশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা কারখানার শ্রমিক হিসেবে দিনের পর দিন কাজ করেন অসংখ্য বাংলাদেশি। প্রচণ্ড গরম, ধুলাবালি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অস্বাস্থ্যকর আবাসন, অপর্যাপ্ত খাবার এবং বিশ্রামের অভাব তাঁদের জীবনের নিত্যসঙ্গী। অসুস্থ হলেও অনেক সময় চিকিৎসার সুযোগ পান না। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা এবং স্থানীয় আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে সমস্যায় পড়লেও সহজে সহায়তা মেলে না।
প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় কষ্ট পরিবার থেকে দূরে থাকা। সন্তান প্রথম হাঁটতে শেখে, প্রথম স্কুলে যায়, বাবা-মা অসুস্থ হন কিংবা পরিবারের কোনো সদস্য মৃত্যুবরণ করেন—এসব মুহূর্তে অনেকেই পাশে থাকতে পারেন না। ঈদ, কোরবানির ঈদ, পহেলা বৈশাখ কিংবা অন্য উৎসবের আনন্দ তাঁদের কাছে সীমাবদ্ধ থাকে মোবাইল ফোনের ভিডিও কলে। পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় মুখে হাসি থাকলেও, কল শেষ হওয়ার পর নিঃসঙ্গ ঘরে নেমে আসে গভীর নীরবতা।
বিদেশে কর্মরত অনেক বাংলাদেশির পাসপোর্ট নিয়োগকর্তার কাছে আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেককে অতিরিক্ত সময় কাজ করানো হলেও ওভারটাইমের পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। কেউ কেউ কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় আহত হন, আবার অনেকেই কর্মস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতেও পরিবারকে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
দেশে ছুটিতে আসাও প্রবাসীদের জন্য আরেকটি বড় সংগ্রাম। ছুটি পাওয়া কঠিন, বিমান ভাড়া অনেক সময় আকাশছোঁয়া, দীর্ঘ যাত্রা, বিমানবন্দরে হয়রানি, অতিরিক্ত লাগেজ নিয়ে জটিলতা এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা তাঁদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেয়। মাত্র কয়েকদিন পরিবারের সঙ্গে কাটিয়েই আবার চোখের পানি লুকিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হয়।
দেশে ফিরে অনেক প্রবাসী নতুন সমস্যার মুখোমুখি হন। আত্মীয়স্বজনের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, প্রতারণার শিকার হওয়া, সঞ্চিত অর্থ সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে না পারা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সামাজিক চাপ তাঁদের নতুন করে হতাশ করে। অনেকেই আবার ঋণ শোধ করতেই বছরের পর বছর বিদেশে থাকতে বাধ্য হন।
তারপরও তাঁরা থেমে যান না। পরিবারের জন্য, দেশের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা প্রতিদিন ঘাম ঝরান। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়, লাখো পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলে, সন্তানদের পড়াশোনা চলে, নতুন ঘর তৈরি হয় এবং দেশের উন্নয়নের চাকা সচল থাকে।
প্রবাসীরা কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী নন; তাঁরা বাংলাদেশের অর্থনীতির নীরব বীর। তাঁদের জন্য নিরাপদ শ্রম অভিবাসন, ন্যায্য মজুরি, উন্নত চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, দূতাবাসের কার্যকর সেবা, বিমানবন্দরে হয়রানিমুক্ত পরিবেশ এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
প্রবাসীদের ঘামে লেখা প্রতিটি রেমিট্যান্সের পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং একজন মানুষের সীমাহীন ত্যাগ। তাই তাঁদের যথাযথ সম্মান, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব
