বিশেষ প্রতিনিধি
আব্দুল্লাহ আল মনির
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা—
প্রকৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও জীববৈচিত্র্যের এক অপূর্ব মিলনভূমি। খুলনা বিভাগের এই উপকূলীয় জেলা একদিকে যেমন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত, ভোমরা স্থলবন্দর, প্রাচীন স্থাপত্য, সুফি সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত জনপদ এবং শত বছরের ইতিহাসের ধারক ও বাহক। শত প্রতিকূলতার মাঝেও এই জেলার মানুষ কৃষি, মৎস্য, চিংড়ি শিল্প, সীমান্ত বাণিজ্য ও পর্যটনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
প্রায় ৩ হাজার ৮৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সাতক্ষীরা জেলায় বসবাস করেন প্রায় ২২ লাখ মানুষ। প্রশাসনিকভাবে জেলাটি সাতটি উপজেলা নিয়ে গঠিত—সাতক্ষীরা সদর, শ্যামনগর, দেবহাটা, কালীগঞ্জ, আশাশুনি, তালা ও কলারোয়া। প্রতিটি উপজেলার রয়েছে স্বতন্ত্র ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পর্যটন সম্ভাবনা।
সাতক্ষীরা সদর: প্রশাসন ও সীমান্ত বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র
প্রায় ৪০০.৮২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সাতক্ষীরা সদর জেলা প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু। জেলার সর্ববৃহৎ ব্যবসায়িক কার্যক্রম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর ও চিকিৎসাসেবার প্রধান কেন্দ্র এই উপজেলা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রবেশদ্বার ভোমরা স্থলবন্দর দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ডিসি ইকোপার্ক, মোজাফফর গার্ডেন অ্যান্ড রিসোর্টসহ বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে।
শ্যামনগর: বাংলাদেশের বৃহত্তম উপজেলা ও সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার
প্রায় ১ হাজার ৯৬৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শ্যামনগর উপজেলা বাংলাদেশের আয়তনের দিক থেকে অন্যতম বৃহৎ উপজেলা। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের একটি বড় অংশ এই উপজেলায় অবস্থিত। যশোরেশ্বরী কালীমন্দির, যেখানে ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পরিদর্শন করেন, বংশীপুর শাহী মসজিদ (টেঙ্গা মসজিদ), খানপুরের ঐতিহাসিক জাহাজঘাটা নৌদুর্গ, কৈখালী, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সীগঞ্জ ও নীলডুমুর পর্যটন এলাকা শ্যামনগরকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন অঞ্চলে পরিণত করেছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির, ডলফিন ও অসংখ্য পাখির আবাসস্থল এই অঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য।
দেবহাটা: বনবিবির ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ সীমান্ত জনপদ
প্রায় ১৭৩.২১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেবহাটা সাতক্ষীরা জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলা। উপজেলা পরিষদের পাশেই অবস্থিত শতবর্ষী ঐতিহাসিক বনবিবি বটতলা দেবহাটার গৌরব। এছাড়া রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র, টাউনশ্রীপুর জমিদার বাড়ি ও পাটবাড়ি মন্দির উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
কালীগঞ্জ: ধর্মীয় ঐতিহ্য, নদী ও সংস্কৃতির জনপদ
প্রায় ৩৩৩.৭৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কালীগঞ্জ উপজেলা নলতা শরীফের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। খান বাহাদুর আহছান উল্লাহ (রহ.)-এর মাজার শরীফ প্রতিবছর হাজারো ধর্মপ্রাণ মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। এছাড়া বাঁশঝাড়িয়া ম্যানগ্রোভ বন, প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ, চন্দ্র ভবন ও কালিন্দী নদীর অপরূপ সৌন্দর্য কালীগঞ্জকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন অঞ্চলে পরিণত করেছে।
আশাশুনি: সুফি সাধক, সম্প্রীতি ও নদীবেষ্টিত জনপদ
প্রায় ৪০২.৩৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের আশাশুনি উপজেলা গুনাকরকাটি খানকাহ শরীফ ও হযরত শাহ আজিজ (রহ.)-এর মাজারের জন্য সুপরিচিত। রামনগরের শতবর্ষী বটগাছ, প্রণব মঠ, দ্বাদশ শিব-কালী মন্দির, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার গির্জা এবং শ্রীউলা এলাকার ঐতিহ্য ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
তালা: প্রত্নতত্ত্ব, নদী ও ঐতিহ্যের উপজেলা
প্রায় ৩৪৪.১৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের তালা উপজেলা কপোতাক্ষ নদের তীরে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক জনপদ। তেঁতুলিয়া শাহী জামে মসজিদ, মাগুরা পীর শাহ জয়নুদ্দিন আউলিয়ার (রহ.)-এর মাজার, গোপালপুর জমিদার বাড়ি, ঝুড়িঝাড়া প্রত্নস্থল, খোলা জানালা ইকো পার্ক ও কপোতাক্ষ নীলিমা ইকো পার্ক তালাকে ইতিহাস ও প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে তুলেছে।
কলারোয়া: প্রাচীন স্থাপত্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী জনপদ
প্রায় ২৩২.৬৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কলারোয়া উপজেলা জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক অঞ্চল। সোনাবাড়িয়া মঠ (সোনামন্দির), কোঠাবাড়িয়া দুর্গ, চেরাঘাট কায়েম মসজিদ, শ্যামসুন্দর মন্দির এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
সাতক্ষীরার প্রতিটি উপজেলা যেন ইতিহাসের এক একটি জীবন্ত অধ্যায়। কোথাও সুন্দরবনের গর্জন, কোথাও সুফি সাধকের দরবার, কোথাও শতবর্ষী বটগাছ, কোথাও প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, জমিদার বাড়ি কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোমরা স্থলবন্দর, চিংড়ি শিল্প, কৃষি, মৎস্য, সীমান্ত বাণিজ্য এবং পর্যটনের অফুরন্ত সম্ভাবনা।
যদি জেলার ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ, পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন, নদী ও পরিবেশ রক্ষা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে সাতক্ষীরা শুধু বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ও ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।
প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের সংগ্রামী জীবনের অনন্য মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা সাতক্ষীরা সত্যিই বাংলাদেশের গর্ব—একটি জেলা, যার প্রতিটি উপজেলা বহন করে শত বছরের ঐতিহ্য, সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের অঙ্গীকার।

বাংলাদেশের বৃহত্তম উপজেলা শ্যামনগর