প্রতিবেদন: গাজী হাফিজুর রহমান
শ্যামনগর প্রতিনিধি
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার নূরনগর ইউনিয়নের কুলতলী, দুরমুজখালী, হাজিপুর, কাটাখালী, রাজাপুর ও রামচন্দ্রপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় অবৈধভাবে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করিয়ে মাছের ঘের পরিচালনার অভিযোগে কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনে নেমে এসেছে চরম সংকট। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি নদীর বাঁধে একাধিক অবৈধ সুইচগেট ও পাইপ (স্থানীয়ভাবে ‘কল’) স্থাপন করে জোয়ারের লবণাক্ত পানি আবাদি কৃষিজমিতে প্রবেশ করানো হচ্ছে। এর ফলে হাজার হাজার বিঘা উর্বর কৃষিজমি আজ চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একসময় এসব এলাকায় ধান, পাট, ডাল, তিল, বিভিন্ন শাকসবজি ও মৌসুমি ফসলের সমৃদ্ধ আবাদ হতো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করিয়ে মাছের ঘেরে রূপান্তর করার ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে অধিকাংশ জমিতে কোনো ধরনের কৃষি ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, হাজারো কৃষক ও কৃষিশ্রমিক জীবিকা হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কুলতলী ও দুরমুজখালী এলাকা দিয়ে প্রবেশ করা লবণাক্ত পানি ধীরে ধীরে হাজিপুর, কাটাখালী, রাজাপুর, রামচন্দ্রপুরসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে শুধু কৃষিজমিই নয়, বসতভিটা, পুকুর, গাছপালা ও স্থানীয় পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে এলাকার অধিকাংশ গাছপালা শুকিয়ে মারা গেছে। নতুন করে গাছ জন্মাতে পারছে না, সবুজায়ন কমে গেছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। ছায়াবৃক্ষের অভাবে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে অন্যত্র বসতি স্থাপন করছে। এলাকাবাসীর মতে, একসময়ের সবুজ-শ্যামল জনপদ আজ ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী এলাকায় পরিণত হচ্ছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, অবৈধ সুইচগেট ও পাইপ স্থাপনের বৈধতা চেয়ে সংশ্লিষ্ট ঘের মালিকরা অতীতে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন। পরে হাইকোর্ট ওই রিট খারিজ করে অবৈধ স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেন বলে এলাকাবাসীর দাবি। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ঘের ব্যবসায়ী ও কল মালিক প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে এখনো অবৈধ সুইচগেট ও পাইপ চালু রেখেছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অবৈধ স্থাপনার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও ব্যাহত হচ্ছে এবং বিভিন্ন সময়ে নদীভাঙনের ঘটনাও ঘটেছে। এতে সরকারি বাঁধ, কৃষিজমি এবং জনবসতি নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী অবিলম্বে সব অবৈধ সুইচগেট ও পাইপ অপসারণ, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন, কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ বন্ধ, নদীর বাঁধ সংরক্ষণ, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
সম্পাদকের নোট:
এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, আদালত-সংক্রান্ত কাগজপত্র ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ডকুমেন্ট সংরক্ষিত রয়েছে। পরবর্তী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সেসব তথ্য, সংশ্লিষ্ট নথির বিশ্লেষণ এবং অভিযুক্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যসহ বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।

















